করোনার কারণে অর্থনীতিতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে সরকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, সেটি আমাদের জিডিপির ৩ শতাংশের বেশি। আমি মনে করি, আগামী দিনগুলোতে এর পরিমাণ আরও বাড়াতে হতে পারে। এই প্রণোদনা প্যাকেজের সাফল্য নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর।বাংলাদেশের এ ধরনের বিশাল পরিমাণের প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের অতীত কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তাই এ প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে সরকার অর্থনীতিতে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ সঞ্চালন করতে যাচ্ছে, তার যথাযথ সুফল নির্ভর করছে বাস্তবায়ন দক্ষতার ওপর।
এ ক্ষেত্রে প্রথমত যেটি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হচ্ছে, এই প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থের সংকুলান কীভাবে হবে। অর্থের সংকুলানের জন্য আমি চারটি উৎস দেখি। প্রথমটি হচ্ছে সরকারের অপ্রয়োজনীয় খরচ ও কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো স্থগিত বা বাতিল করে সেখান থেকে যে অর্থ সাশ্রয় হবে, তা প্রণোদনা প্যাকেজের জন্য কাজে লাগানো।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে, বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নেওয়া। আমরা জানি, বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার কারণে স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়ার সুবিধা অনেকটা হারিয়েছে। কিন্তু এ রকম সংকটের সময় স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে ঋণ পেতে বাংলাদেশ বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে দর-কষাকষি করার চেষ্টা করতে পারে।
তৃতীয় উপায়টি হয়তো খুব সুখকর নয়। কিন্তু তারপরও সরকারকে হয়তো ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নিতে হবে। আমরা জানি, ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে সংকটের মধ্যে আছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই পুরো অর্থবছরে ঋণ নেওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, সরকার তার চেয়েও বেশি নিয়ে ফেলেছে। তারপরও যদি অর্থের প্রয়োজন হয়, সরকারকে ব্যাংক থেকে টাকা নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে আমি মনে করি, যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে ব্যাংক থেকে টাকা নেওয়া দরকার।
চতুর্থ উপায়টি হচ্ছে টাকা ছাপানো। তবে আমি মনে করি, এটিকে একদমই শেষ উপায় হিসেবে রাখা দরকার।
প্রণোদনার অর্থসংকুলানের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা। প্রণোদনা প্যাকেজের দুটি দিক আছে। একটা হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাতের জন্য সহায়তা। আরেকটি হচ্ছে, দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংকট ও অন্যান্য সমস্যা মোকাবিলা। এই দুটি ক্ষেত্রে কীভাবে অর্থ বিতরণ করা হবে, কে পাবে এবং কীভাবে পাবে, এই পুরো প্রক্রিয়া কার্যকরী হতে হবে। আমাদের আমলাতন্ত্র ও সরকারি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা আছে। আমরা জানি, বিভিন্ন বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক দক্ষতা বা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন আছে। এগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। খেয়াল করা দরকার, যখন বিশাল পরিমাণ অর্থ ছাড় হবে, তখন এটির অন্যায় সুযোগ নেওয়ার জন্য অনেকেই ওত পেতে থাকবে। তার কিছু কিছু আলামত আমরা ইতিমধ্যে দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং নিশ্চিত করতে হবে যে যারা প্রকৃত অর্থে ক্ষতিগ্রস্ত, তারাই যেন সাহায্য পায়।
(0) Comments
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন