নতুন করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট মহামারিতে আক্ষরিক অর্থেই পর্যুদস্ত আমেরিকা। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা সব বিচারেই আমেরিকা বিশ্বের অন্য সব দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এই ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালি আচরণ বেড়েই চলেছে। এই বলছেন, সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হচ্ছে। আবার বলছেন, দ্রুত ব্যবসা-বাণিজ্য সচল করাটাই তাঁর অগ্রাধিকার তালিকাভুক্ত। খামখেয়ালি আচরণ আর এখন কথায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে সারা বিশ্বে চলমান মহামারির কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে আমেরিকা। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে নিশ্চিত আক্রান্ত হয়েছে বলে শনাক্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় ২১ লাখ। আর মৃতের সংখ্যা এরই মধ্যে ছাড়িয়ে গেছে ১ লাখ ৩৭ হাজার। বিশ্বজুড়ে মোট মৃতের পাঁচ ভাগের একভাগই আমেরিকায়।
আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে করোনা উপদ্রুত অঞ্চল হচ্ছে নিউইয়র্ক। গোটা আমেরিকায় নিশ্চিত সংক্রমণের শিকার হয়েছে এমন ব্যক্তিদের ৩০ শতাংশের বেশির বাস নিউইয়র্কে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যমতে, ১৬ এপ্রিলেই আমেরিকায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ লাখ। এরই মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৩০ হাজার ৯৮৫ জনের বেশি মানুষ। এর মধ্যে শুধু নিউইয়র্কেই আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আর মৃতের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এই যখন অবস্থা, তখনো নিজের আচরণে লাগাম পরাতে পারছেন না ডোনাল্ড ট্রাম্প।
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের মধ্যে নিউইয়র্ক নগরের অবস্থা সবচেয়ে বাজে। নগরটিতে এরই মধ্যে প্রায় ১১ হাজার মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। অথচ এই সংখ্যা নিয়েও রাজনীতি করতে ছাড়ছেন না ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১৫ এপ্রিল নগরীর মেয়র বিল ডি ব্লাজিওর বিরুদ্ধে মৃতের সংখ্যা বাড়িয়ে প্রচার করার অভিযোগ তোলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
১৫ এপ্রিল নিউইয়র্ক নগর কর্তৃপক্ষ জানায়, কোভিড-১৯ এর উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ হাজার ৭০০ লোক মারা গেছেন। এই লোকেরা কখনো করোনা শনাক্তের পরীক্ষা করেননি। এই সংখ্যা প্রকাশের পরই ট্রাম্প নগরের মেয়র বিল ডি ব্লাজিওকে এক হাত নেন। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় গঠিত হোয়াইট হাউসের টাস্ক ফোর্সের নিয়মিত ব্রিফিংয়ের সময় ট্রাম্প মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য সরাসরি নিউইয়র্ক নগর কর্তৃপক্ষকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান। একই সঙ্গে জানান, আমেরিকায় প্রতিটি মৃত্যুর বিষয়ে যথাযথভাবে তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের এমন মন্তব্য সবাইকে হতচকিত করে দেয়। এ বিষয়ে বিল ডি ব্লাজিও অবশ্য কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তাঁর মুখপাত্র ফ্রেডি গোল্ডস্টেইন বলেন, ‘এই মানুষগুলোর একটা নাম ছিল, ছিল শখ ও সর্বোপরি একটি জীবন। ভালোবাসার মানুষকে কাঁদিয়ে তাঁরা চলে গেছেন। তাঁদের নাম মুছে না দিয়ে আমাদের এই ক্ষতি স্বীকার করতে হবে।
শুধু এমন মন্তব্যই নয়। কিছুদিন আগে ব্যবসা-বাণিজ্য চালুর বিষয়ে জোর মন্তব্য করেন ট্রাম্প। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব এখন পড়তে শুরু করেছে। ট্রাম্প অর্থনীতি সচলের কথা বলার পর স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ ও বিরোধী ডেমোক্র্যাট শিবির থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। এখন পর্যন্ত তা আমলে নিচ্ছেন বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, তাঁর এমন মন্তব্য বা চাওয়ার কথা জনপরিসরে প্রচারের পরই ঘটতে শুরু করেছে বিপত্তি। এমনিতেই করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ও প্রতিনিয়ত আসা মৃত্যুর সংবাদে মানুষ বিপর্যস্ত। সঙ্গে প্রতিরোধ কৌশল হিসেবে ঘরে থাকা ও জমায়েত না হওয়ার নীতি অনুসৃত হওয়ায় হাঁপিয়ে উঠেছে মানুষ। স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবেই মানুষ এসব বিধিনিষেধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। এর মধ্যে আগুনে ঘি ঢালছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট। তাঁর অর্থনীতি চালুর কথা তাই অনেক মানুষকে নিয়ম ভাঙার উসকানি দিচ্ছে। মিশিগানেই যেমন ঘরে থাকার নির্দেশ অমান্য করে অনেকে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।
এদিকে যে অর্থনীতি সচল করতে প্রেসিডেন্ট এত উদ্গ্রীব, তার চলমান ক্ষয়ক্ষতির দিকে নজর দিতে তিনি একেবারেই অনিচ্ছুক। প্রচলিত পরিষদের বদলে তিনি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ও ব্যবসা-বাণিজ্য সচলের লক্ষ্যে শিল্পপতিদের বেশ কয়েকটি গ্রুপের সমন্বয়ে একটি কাউন্সিল তৈরি করেছেন। এসব গ্রুপের সঙ্গে তিনি এরই মধ্যে ফোনে চারটি আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। কিন্তু যাদের নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবেন বলে তিনি মনস্থির করেছেন, সেই শিল্পপতিরা জানাচ্ছেন, তাঁরা এ বিষয়ে খুব কমই জানেন। তাঁদের কেন এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, তাঁদের করণীয়ই বা কী, সে সম্পর্কেও তাঁরা তেমন কিছু জানেন না। সব মিলিয়ে গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ‘ওপেনিং আওয়ার কান্ট্রি কাউন্সিল’ নামে যে পরিষদের কথা বলেছেন, তা সে সময় যেমন অপরিচিত ঠেকছিল, এখনো এর সঙ্গে যুক্ত বা যুক্ত নয় এমন সব লোকের সম্পর্ক অপরিচয়ের পর্যায়েই।
১৪ এপ্রিল ট্রাম্প বিনোদন, ব্যাংকিং, জ্বালানি, গবেষকসহ ১৭টি খাতের শীর্ষ নেতৃত্বের সংযোগে এই কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে এর সঙ্গে কারা আছেন বা থাকবেন, তাদের কাজ কী হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো কিছু নির্ধারণ হয়নি। অথচ এ নিয়ে বড় বড় বক্তব্য দেওয়া সারা। এমনকি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ১ মের আগেই ঘরে থাকা নীতি শিথিল করতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট। আর এই প্রশাসনিক তৎপরতার খোঁজ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের ঘরবন্দী মানুষকে উসকে দিচ্ছে রাস্তায় নেমে আসার জন্য।
চলতি সপ্তাহেই ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার শীর্ষ সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ফাউসির সঙ্গে তর্কে জড়ান। সর্বশেষ তর্কটির মূলে ছিল সংকটের চূড়ান্ত রূপ আমেরিকা দেখেছে, না কি এখনো অনেক বাকি। ট্রাম্পের মত ছিল, আমেরিকা সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতিটি পার হয়ে গেছে। যদিও ফাউসির মত ছিল, এখনো অনেক বাকি। আরও অনেক সতর্ক থাকা জরুরি। শুধু তাই নয়, কিছুদিন আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বারবার সংশয় প্রকাশ সত্ত্বেও নিজের মতো করে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, করোনা চিকিৎসায় হাউড্রোক্সিক্লোরোকুইন কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
চলতি সপ্তাহেই ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার শীর্ষ সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ফাউসির সঙ্গে তর্কে জড়ান। সর্বশেষ তর্কটির মূলে ছিল সংকটের চূড়ান্ত রূপ আমেরিকা দেখেছে, না কি এখনো অনেক বাকি। ট্রাম্পের মত ছিল, আমেরিকা সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতিটি পার হয়ে গেছে। যদিও ফাউসির মত ছিল, এখনো অনেক বাকি। আরও অনেক সতর্ক থাকা জরুরি। শুধু তাই নয়, কিছুদিন আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বারবার সংশয় প্রকাশ সত্ত্বেও নিজের মতো করে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, করোনা চিকিৎসায় হাউড্রোক্সিক্লোরোকুইন কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বলে দেয়, তাঁর চোখের সামনে এখন শুধুই নির্বাচন। আগামী নভেম্বরে যথাসময়ে নির্বাচন হবে কি হবে না—সে বিষয়টি এখনো কেউ নিশ্চিত করে বলতে না পারলেও, এই দুর্যোগের মধ্যেই নিজের প্রচারের জন্য তিনি যা নয় তাই করছেন। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়, অনুদানের চেকে নিজের নামে স্বাক্ষর থাকার ব্যাপারে জোর করার বিষয়টি। সাধারণত এ ধরনের চেকে অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সই করেন। কিন্তু ট্রাম্প চাইছেন তাঁর নামের সই থাকুক। উদ্দেশ্যটি পরিষ্কার। নির্বাচনের আগে আগে সাধারণ মানুষকে তিনি জানাতে চান, তাঁদের এ দুঃসময়ে প্রেসিডেন্ট তাঁদের পাশে আছেন। অনেকটা এমন যে, ট্রাম্প নিজের পকেট থেকে অর্থ দিয়ে তাঁদের সাহায্য করছেন। অথচ, সত্য তো এই যে, এ অর্থ জনগণেরই, যা তারা কর হিসেবে রাষ্ট্রকে দিয়েছিল।
এভাবে নির্লজ্জভাবে নিজের প্রচার চালানোর পাশাপাশি সংকটের শুরুতে ত্বরিত পদক্ষেপ না নেওয়ায় যে সমালোচনা হচ্ছিল, তার মুখ বন্ধ করতে এক অভিনব পদক্ষেপ নিয়েছেন ট্রাম্প। সব দোষ নাকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার। তাই তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অর্থায়ন বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো বুঝি একেই বলে। মূল লক্ষ্য হচ্ছে, এই মহামারি পরিস্থিতিকে জয় করেছেন মর্মে বিজয়পতাকা ওড়ানোর কৃতিত্বটি নেওয়া এবং পরবর্তী নির্বাচনে জয়ের নিশ্চয়তা আদায় করা। এ জন্য তিনি শুধু আমেরিকা নয়, সারা বিশ্বের মানুষের জীবনকেই ঝুঁকিতে ফেলতেও এমনকি প্রস্তুত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অর্থায়ন তুলে নেওয়া এবং ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও মার্কিন অর্থনীতিকে সচল করার সিদ্ধান্ত অন্তত সে কথাই বলে। বিভিন্ন ইতিবাচক তথ্য তিনি মানুষকে আশাবাদী করতে বা সাহস জোগাতে প্রকাশ করতে চাইছেন না, তিনি প্রকৃত পরিস্থিতি লুকাতেই এটি করতে চাইছেন। যেকোনো মূল্যে নিজেকে বিজয়ী দেখতে চান তিনি। এ জন্য প্রয়োজনে মিথ্যা জয়ের ধ্বজা ওড়াতেও তিনি প্রস্তুত, প্রস্তুত আরও অগণিত মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে।

(0) Comments
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন